২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

মেঘনা-বুড়িগঙ্গা চিরে সমুদ্রকন্যার সন্ধানে: একটি স্মৃতির সফর

প্রকাশিত এপ্রিল ২০, ২০২৬, ০৬:০০ পূর্বাহ্ণ
মেঘনা-বুড়িগঙ্গা চিরে সমুদ্রকন্যার সন্ধানে: একটি স্মৃতির সফর

রেজওয়ান আহমদ: আমাদের দেশটা যে কতটা সুন্দর, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। বিশেষ করে যারা আনন্দ ভ্রমণ করেন, কেবল তারাই বলতে পারেন এ দেশের আনাচে-কানাচে কত দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা ছড়িয়ে আছে। নিজের চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই আমাদের মাতৃভূমি কতটা রূপবতী। আমরা কয়েকজন মিলে গত কয়েকদিন ধরে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছিলাম, কিন্তু কোনো না কোনো সমস্যায় তা পিছিয়ে যাচ্ছিল। আসলে পরিকল্পনা করে অনেক সময় কিছু হয় না; আপনি ভাববেন এক, আর হবে আরেক। তাই হঠাৎ করে হয়ে যাওয়া সফরগুলোই বেশি আনন্দদায়ক হয়। আমাদের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হলো।

১৪ এপ্রিল রাতে আমরা জিন্দাবাজারের ‘অনন্যা নেট’-এ বসে গল্প করছিলাম। হঠাৎ সিনিয়র সাংবাদিক আরিফ ভাই বরিশালে আনন্দ ভ্রমণে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। আমরা সবাই একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। সিদ্ধান্ত হলো ১৬ এপ্রিল ট্রেনযোগে যাওয়া হবে এবং ১৫ এপ্রিল টিকিট সংগ্রহ করা হলো। ১৬ এপ্রিল ভোর ৪টায় আমি ঘুম থেকে উঠে একে একে আরিফ ভাই, সোহেল, সবুজ ও মাজিদকে কল দিলাম। সবাই দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। আরিফ ভাই সরাসরি স্টেশনে চলে গেলেন। সবুজ বাইশটিলা থেকে সিএনজি নিয়ে আম্বরখানায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। পরে আম্বরখানা বড় বাজার থেকে মাজিদ, ইলেকট্রিক সাপ্লাই থেকে আমি এবং কুমারপাড়া থেকে সোহেল একত্রিত হয়ে ৫টা ৪০ মিনিটে স্টেশনে পৌঁছলাম।

সবাই মিলে একটি ছবি তুলে স্টেশনে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ট্রেনে উঠে পড়লাম। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে চালক ‘কালনী এক্সপ্রেস’ ছাড়লেন। শুরু হলো আমাদের যাত্রা। ট্রেনের ভেতরে আড্ডা আর গল্পের মাঝে আরিফ ভাই শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি আনারস খাওয়ালেন। সেই আনারসের স্বাদ যেন সারা পথ জিহ্বায় লেগে থাকল। এরই মধ্যে হাজির হলেন তৃতীয় লিঙ্গের দুইজন মানুষ। তারা ১০ টাকা চাইলে আমি তা দিয়ে দিলাম, ট্রেনে যাতায়াতকারীদের কাছে এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। ট্রেনের ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর চানাচুর, শসা, বাদাম, চা ও আনারস নিয়ে হকাররা আসছিল, আর আমরাও আনন্দ করে সেগুলো কিনে খাচ্ছিলাম। দুপাশের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে আমরা কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছলাম।

স্টেশন থেকে নেমে অটো রিকশা করে আমরা সরাসরি চলে গেলাম পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘স্পেশাল হানিফ বিরিয়ানি’ খেতে। এই দোকানে সবসময় ভিড় লেগেই থাকে। আমরা ৫ জনের জন্য ৫ প্লেট অর্ডার দিলাম। বিরিয়ানি আসতে দেরি দেখে আমরা বোরহানি অর্ডার করে নিমেষেই বোতল খালি করে ফেললাম। প্রায় ১৫ মিনিট পর কাঙ্ক্ষিত বিরিয়ানি এলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সবার আগে সোহেলের প্লেট খালি হলো। বিরিয়ানি এতই সুস্বাদু ছিল যে এক প্লেটে কারও পেট ভরল না। সোহেল সিলেটি ভাষায় আরিফ ভাইকে বলল, “আরেকটা আনালাইন ভাই, বাটিয়া খাইমুনে (অর্ধেক করে ভাগ করে খাব)!” কিন্তু আরিফ ভাই বুঝলেন এক প্লেটে হবে না, তাই আবারও ৫ জনের জন্য ৫ প্লেট অর্ডার করা হলো। লেবু, শসা আর কাঁচা মরিচের সাথে বিরিয়ানি খাওয়ার সেই প্রতিযোগিতা ছিল দেখার মতো।

খাওয়া শেষে ২০০ টাকা ভাড়ায় অটো করে আমরা সদরঘাট গেলাম। সেখানে সোহেল আমাদের ২০ টাকা পিস দরে মিষ্টি তরমুজ খাওয়াল। এরপর জনপ্রতি ১০ টাকার টিকিট কেটে সদরঘাটে প্রবেশ করলাম। বরিশালে যাওয়ার জন্য এম-কে ৭ জাহাজটি দেখলেও কেবিন পছন্দ না হওয়ায় আমরা ‘পারাবত-১৮’ জাহাজের টিকিট নিলাম। টার্মিনালে এম-কে ৭, পারাবত, অ্যাডভেঞ্চার, সুন্দরবনসহ অসংখ্য বিশাল জাহাজ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল।

রাত ৯টা ৩০ মিনিটে জাহাজ ছাড়ার কথা। আমরা সন্ধ্যা ৬টাতেই টিকিট কেটে জাহাজে উঠে ফ্রেশ হয়ে আবারও নিচে নামলাম রাতের খাবার ও কিছু কেনাকাটা করতে। আমি একজোড়া জুতো কিনলাম, আরিফ ভাই কিনলেন স্কুল ব্যাগ আর সোহেল কিনলেন লুঙ্গি। ৯টা ৩০ মিনিটে নাবিক জাহাজ ছাড়লেন। বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে রাতের অন্ধকার চিরে আমাদের জাহাজ এগিয়ে চলল। জাহাজে হাজারো যাত্রীর ভিড়। সদরঘাট থেকে ২৫০ টাকায় একটি বিশাল তরমুজ কিনে আনা হয়েছিল। আমি আর আরিফ ভাইয়ের ডায়াবেটিস থাকায় আমরা সামান্য খেলেও সোহেল, সবুজ ও মাজিদের মধ্যে তরমুজ খাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। সোহেল প্রথম, সবুজ দ্বিতীয় এবং মাজিদ তৃতীয় হলো। জাহাজের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা টাইটানিকের সেই বিখ্যাত অনুভূতি নিচ্ছিলাম; প্রচণ্ড বেগে আসা বাতাস শরীর ও মনকে সতেজ করে দিচ্ছিল।

ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে আমরা বরিশাল নৌবন্দরে পৌঁছলাম। সকালের নাস্তা ও বিশ্রামের জন্য বরিশাল ফল বাজারের পাশেই ‘রোদেলা ইন্টারন্যাশনাল’ হোটেলে রুম বুক করলাম। সবাই ফ্রেশ হওয়ার পর সোহেল ও সবুজ জাহাজের মধ্যে খাওয়ার পর অবশিষ্ট তরমুজটুকু সাবাড় করল হোটেলের মধ্যেই। কথা ছিল বরিশাল শহর ঘুরে দেখব, কিন্তু সবুজের প্রস্তাবে সবাই কুয়াকাটা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। হোটেল থেকে বেরিয়ে অটো চালকের পরামর্শে ‘ঘরোয়া’ রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। প্রথমে নান-পরটা ও ভাজির কথা অর্ডার দিলেও, সেখানে গিয়ে গরম সিদ্ধ চালের ভাতের সুগন্ধ আর বাহারি ভর্তা দেখে আমাদের মন বদলে গেল। তৃপ্তিভরে ভর্তা-ভাত খেয়ে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে বরিশাল বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছলাম কুয়াকাটা যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

৯টা ৫ মিনিটে বাস ছাড়ার সময় সবুজ ও মাজিদ বাসস্ট্যান্ডে রয়ে গিয়েছিল। আমাদের অনুরোধে চালক হেলপারকে দিয়ে অটোরিকশা করে তাদের বাসে তুলে নিলেন। দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে আমরা কুয়াকাটা পৌঁছলাম। ১০ টাকা ভাড়ায় অটোরিকশা নিয়ে পৌঁছলাম সেই কাঙ্খিত কুয়াকাটার সমুদ্রের পাড়ে। সাগরের বিশাল ঢেউ সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিল। শুক্রবার হওয়ায় ১টায় আমরা জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে গেলাম। নামাজ শেষে সৈকতে ফিরে অনেক আনন্দ করলাম। সোহেল ৪০০ টাকায় একটি মোটরসাইকেল ভাড়া করে। আমি ও সোহেল মোটর সাইকেল যোগে গঙ্গামতির চর, কাউয়ার চর, লেবুর বন ও সূর্যোদয় দেখার স্থানগুলো ঘুরে দেখলাম। সময়ের অভাবে সূর্যাস্ত দেখা সম্ভব হলো না।

বিকেল ৪টায় সামুদ্রিক মাছ (সী ফিশ) দিয়ে খাবার শেষ করে আমরা আবার বরিশালের পথে রওনা হলাম বিআরটি এসি বাস যোগে। রাত ৮টায় বরিশাল পৌঁছে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ জাহাজের টিকিট কেটে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। রাত ৯টা ২৫ মিনিটে জাহাজ ছাড়ল। তিনটি জাহাজ একসাথে পাল্লা দিয়ে চলছিল, যা যেমন সুন্দর তেমনি কিছুটা আতঙ্ক জাগানিয়া। সকাল ৬টায় সদরঘাট পৌঁছে আমরা নাজিরাবাজারের একটি হোটেলে বিশাল নান-পরটা ও ডাল-ভাজি দিয়ে নাস্তা করলাম।

এরপর কেনাকাটার জন্য নিউ মার্কেট ও গাউছিয়া গেলাম। কিন্তু মার্কেট খোলে সকাল ১০টায়, আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম ৮টায়। ২ ঘণ্টা অপেক্ষা করে কেনাকাটা শেষ করে দুপুর ১২টায় কমলাপুর স্টেশনে এলাম। তবে রেল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা দেখে আমরা অবাক হলাম। হাজার হাজার যাত্রীর জন্য বিশ্রামাগারটি ছিল অত্যন্ত ছোট। আমাদের কালনী এক্সপ্রেস ২টা ৫৫ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি ছাড়ল ৪টা ৪৫ মিনিটে। এই ভোগান্তি সিলেটগামী যাত্রীদের নিত্যসঙ্গী। আরও অবাক হলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিছু সংখ্যক যাত্রীকে দেখে, যারা বিনা টিকেটে ট্রেনে উঠে বুক ফুলিয়ে বলে, ‘আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোক’। রেল কর্তৃপক্ষও তাদের কাছে অসহায়।

ট্রেনের ভেতরে আড্ডা আর স্মৃতিচারণ করতে করতে রাত ১টায় আমরা সিলেট স্টেশনে পৌঁছলাম। সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে প্রথমে আরিফ ভাইকে উপশহরে, সোহেলকে কুমারপাড়ায়, আমাকে ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ে এবং মাজিদকে বড় বাজারে নামিয়ে দিয়ে সবুজ আম্বরখানা হয়ে বাইশটিলায় ফিরে গেল। এভাবেই শেষ হলো আমাদের জীবনের অন্যতম সেরা একটি আনন্দ ভ্রমণ। এই সফরের স্মৃতি যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।

এই নিউজ ৩১০ বার পড়া হয়েছে