এবার সিলেটের এমসি কলেজের অধ্যক্ষ হতে চান সিলেট সরকারি কলেজের আলোচিত অধ্যাপক নাছিমা হক খান। যিনি তৎকালীন শেখ হাসিনা আমলে কলেজে উপস্থিত না থেকেও পদোন্নতি ভাগিয়ে নিয়েছেন, করোনার সময় কলেজ বন্ধ থাকা সত্বেও পরীক্ষার ফি, বাস ভাড়া সহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন। সেই অধ্যাপককে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ বানাতে তোড়জোড় হচ্ছে। এই সংবাদ জানাজানি হলে হাসিনা আমলে বঞ্চিত থাকা শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রফেসর নাছিমা হক খান তৎকালীন শেখ হাসিনা আমলে ছিলেন সিলেট অঞ্চলের প্রভাবশালী শিক্ষক নেত্রী। যার কথা ছাড়া সিলেট সরকারি কলেজে একটি কাজও হতো না। যিনি তার কথার বাইরে যাওয়া শিক্ষকদের ঘায়েল করতে নারী হয়রানী সহ নানা অভিযোগে থামিয়ে দিতেন। যার কারণে সরকারি কলেজের বেশ কয়েকজন বিএনপিপন্থী শিক্ষকের পদোন্নতি হয়নি। এখনো অনেকে আটকে আছেন আগের জায়গায়। কিন্তু, এরই মধ্যে নাছিমা হক তার সকল কাজ করে যাচ্ছেন।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কিছুটা নিরব থাকলেও সিলেটের দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হতে মন্ত্রণালয়ে জোর লবিং শুরু করেন তিনি। পরে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ সামনে এলে তিনি কিছুটা পিছু হটেন। পরে সিলেট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হতে বিএনপি-জামায়াতের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সাথে জোর লবিং চালান। কিন্তু, অন্তবর্তীকালীর সরকারের সময়ে সেখানেও তিনি ব্যর্থ হন। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এবার তিনি সিলেটের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজের অধ্যক্ষ হতে জোর লবিং শুরু করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এই খবর মঙ্গলবার ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। যারা বিগত সরকারের আমলে বঞ্চিত ছিলেন, তারা বেশ হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
এদিকে, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত নাছিমা হক আবারও অধ্যক্ষ হতে লবিং শুরু করেছেন, এই সংবাদ জানাজানি হলে সিলেটে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অনেকে বলছেন ফ্যাসিস্ট যুগে সকল অবৈধ সুবিধা পাওয়া শিক্ষক দম্পতির স্ত্রী কিভাবে এখনো পদে রয়েছেন। যেখানে তার বিরুদ্ধে হওয়া সকল অভিযোগে তিনি শাস্তি পাওয়ার কথা, সেখানে তিনি কিভাবে আবার অধ্যক্ষ হতে লবিং করার সাহস পান। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সূত্রে জানা যায়, শেখ হাসিনা আমলে নানা সুবিধা ভোগ করলেও ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদল করেছেন-এই যুক্তি দিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদবির শুরু করেন। এ প্রক্রিয়ায় তিনি অনেকটা সফলও হয়েছিলেন। তবে, বিএনপিপন্থী শিক্ষক নেতাদের প্রবল আপত্তির মুখে বিষয়টি আটকে আছে।
কেন এত অভিযোগ প্রফেসর নাছিমা হকের বিরুদ্ধে?
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও মাউশির উচ্চমহলের ঘনিষ্ঠজন হওয়ার সুবাদে তাৎক্ষণিক বদলীর আদেশ অমান্য করে সাড়ে ৫ মাস কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান নাছিমা হক খান। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সিলেট সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ না থাকায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে করেছেন নানা অনিয়ম আর দুর্নীতি। নিজ বলয়ের না হওয়ায় আক্রোশের বশবর্তী হয়ে এসিআর -এ অসত্য-বিরূপ মন্তব্য করেছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষককে। করেছেন অনেকের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ। আটকে দিয়েছেন চাকুরী স্থায়ীকরণ। অধ্যক্ষ হতে না পারায় কলেজে যাননি দীর্ঘ ১৬ মাস। তবুও তিনি ভোগ করেছেন সকল সুযোগ-সুবিধা। উল্টো তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরা পড়েছেন নানাবিধ সমস্যায়। এরকম আরো অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কর্মস্থলে না থেকেও পদোন্নতি:
২০২২ সালের ২০ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নাছিমা হক খানকে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া সরকারি কলেজে বদলি করা হয়। বদলীর আদেশ অমান্য করে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এ অবস্থায়ই ২০২৩ সালের ২০ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরেকটি প্রজ্ঞাপনে নাছিমা খানকে সিলেট সরকারি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক (সংযুক্ত) দেখিয়ে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় ইনসিটু হিসেবে। পদোন্নতির আদেশে তার বর্তমান কর্মস্থল সিলেট সরকারি কলেজে দেখানো হয় এবং পুনরায় তাকে ইনসিটু হিসেবে পদায়ন করা হয়। যেকোনো পদোন্নতি নিতে হলে কর্মস্থলে কর্মরত থাকতে হয়। কিন্তু নাছিমা হক আগের কর্মস্থলে কর্মরত দেখিয়ে পদোন্নতি নেন। পদোন্নতি পাওয়ার ১৫ দিন পর তিনি সিলেট সরকারি কলেজে যান। তখন কলেজে অধ্যাপক (ইনসিটু) পদে যোগদানের জন্য সহযোগী অধ্যাপকের পদ না থাকায় এবং আদেশে কর্মস্থল ভুল থাকায় তাঁর আবেদন ফিরিয়ে দেন তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল আনাম মো. রিয়াজ। নাছিমা হকের যোগদান প্রসঙ্গে ওই বছরের ১০ এপ্রিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে একটি পত্র দেন। পত্রে জানান, প্রফেসর নাছিমা হক সিলেট সরকারি কলেজে ছিলেন না এবং সহযোগী অধ্যাপকের পদ না থাকায় ইনসিটু হিসেবে তার যোগদানের কোনো সুযোগ নেই। এর কয়েকদিন পর আবুল আনাম মো. রিয়াজ মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে বদলী হন। তখন সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আসিফা আক্তার মিতুকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিয়ে যান। কিন্তু, নাছিমা হক খান আবারো তথ্য গোপন করে কলেজের জ্যৈষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে তার নিকট ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব না দেওয়ায় মাউশির মহাপরিচালক বরাবর পত্র লিখে তাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য আবেদন জানান। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের ১লা জুন নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে প্রফেসর এ জেড এম মাঈনুল হোসেনকে পদায়ন দেন।
দলীয় প্রভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার :
প্রফেসর নাছিমা হক খান কলেজে বিভিন্ন মেয়াদে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সাথে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করে গেছেন। তার এই অনিয়ম-দুর্নীতিতে কলেজের যেসকল শিক্ষক সহযোগিতার বদলে প্রতিবাদ করেছেন, তাদেরকে তিনি নানাভাবে হয়রানি করেছেন। তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ থাকাকালে ১০ জন শিক্ষকের এসিআরে একাধারে তিন বছর (২০১৮-১৯-২০) মিথ্যা বিরূপ মন্তব্য প্রদান করেছেন। যে কারণে ২ জন শিক্ষকের চাকরি যথাসময়ে স্থায়ী হয়নি এবং একজনের দুই-দুইবার পদোন্নতি আটকে গেছে শুধুমাত্র এসিআরে তার মিথ্যা অভিযোগ দেওয়ার কারণে। তবুও তিনি ক্ষান্ত হননি, তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য ২০২১ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান বানচালের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। আর সর্বশেষ তিনি ৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন মাউশিতে। পরে ওই ঘটনার তদন্তকালে ঘটনার পক্ষে প্রত্যক্ষদর্শী কেউ সাক্ষ্য না দিলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে ৩ লাইনের এক মন্তব্য ৪ জন শিক্ষককে সরাসরি অভিযুক্ত করেন। প্রফেসর নাছিমা হক অধ্যক্ষ থাকাকালে বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতেন এবং কলেজের সকল প্রোগ্রামেই জেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দেখা যেত। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. নাজমুল ইসলামের সাথে তার ছিল বেশ সখ্যতা। কলেজে কোনো প্রোগ্রাম হলে সেখানে তিনি তাকে অতিথি করতেন এবং কলেজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ এলে সেটা নাজমুলকে দিয়েই করাতেন।
নাছিমা হকের অনিয়ম-দুর্নীতি:
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হওয়ার পর তিনি আগে থেকে তৈরি থাকা কলেজের অধ্যক্ষের অনার বোর্ডে তার নামের স্টিকার লাগিয়েছেন। কিন্তু তিনি নতুন অনার বোর্ড তৈরির বিল ভাউচার করে ৩৬ হাজার টাকা উত্তোলন করেনে। অথচ তার নামের ওই স্টিকার লাগাতে ব্যয় হয় মাত্র ৫০০ টাকা। করোনার কারণে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কোনো পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। অথচ ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা তহবিল থেকে দুটি চেকে ৪ লাখ ৪ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। কলেজ এবং শিক্ষার্থী পরিবহনের বাস বন্ধ থাকলেও তিনি প্রতিমাসে তিনটি গাড়ি বাবদ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কলেজ বন্ধের সময় উন্নয়ন তহবিল হতে ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে তিনি ৪ লাখ ২১ হাজার টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছেন।
অভিযোগের তদন্ত:
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে মাউশি সিলেটের আঞ্চলিক পরিচালককে নাছিমার দূর্নীতি তদন্তের নির্দেশ দেয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই তদন্ত কর্মকর্তা অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নান খান ও অভিযুক্ত নাছিমা হক সিলেটের টিলাগড়স্থ গ্রিন টাওয়ারের বাসিন্দা এবং আত্মীয়ও বটে। তখন তিনি আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকায় ও নুরুল ইসলাম নাহিদের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় সব অনিয়ম দুর্নীতির তদন্ত ধামাচাপা দিতে সমর্থ হন৷
অভিযুক্ত প্রফেসর নাছিমা হক খান তখন সবকিছু অস্বীকার করে দাবি করেন, বদলীর অর্ডার রিভাইজ হয়েছে। এসব ভুল তথ্য। তৎকালীন অধ্যক্ষের পাঠানো পত্র ভুল ছিল।
এই নিউজ ৩১৩ বার পড়া হয়েছে