ধর্ম যখন বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ‘কর্পোরেট স্ক্যাম’
লেখক: জাহিদ হাসান
মানুষের আদিমতম ভয় ও মৃত্যুবর্তী অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করে হাজার বছর ধরে যে বাণিজ্য চলছে, তার নাম ‘ধর্ম’। আধুনিক অর্থনীতির ভাষায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এটি এমন এক ব্যবসা, যেখানে কোনো দৃশ্যমান পণ্য নেই, বিক্রয়-পরবর্তী সেবাও নেই; অথচ এর লভ্যাংশ প্রায় শতভাগ নিশ্চিত।
যেকোনো ব্যবসার শুরুতে যেমন প্রোস্পেক্টাস থাকে, ধর্মগ্রন্থও তেমন একটি কাঠামো তৈরি করে।
এখানে ‘পুরস্কার ও শাস্তি’ মডেল প্রয়োগ করা হয়েছে—“এখন বিনিয়োগ করো, মৃত্যুর পর ফল পাবে।” যেহেতু মৃত্যুর পর কেউ অভিযোগ করতে ফিরে আসে না, তাই এই ব্যবস্থায় কোনো ‘রিফান্ড পলিসি’ নেই।
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী Pascal Boyer তার
Religion Explained গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ধর্ম মানুষের মস্তিষ্কের ‘অর্থনৈতিক ভীতি’কে কাজে লাগিয়ে আনুগত্য আদায় করে।
মসজিদ, মন্দির বা গির্জা—আধুনিক বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে এগুলো বিশেষায়িত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।
ভারতের Tirupati Balaji Temple কিংবা Mecca–Medina কেন্দ্রিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে বার্ষিক লেনদেন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
এ ছাড়া Vatican City-এর নিজস্ব ব্যাংক রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গণ্য।
‘জনসেবা’ বা ‘আধ্যাত্মিকতা’র আড়ালে এসব প্রতিষ্ঠান করমুক্ত সুবিধা ভোগ করে, যা সাধারণ ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব। এতে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি সমান্তরাল কাঠামো তৈরি হয়।
ধর্মগুরুরা এই ব্যবস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর। অনুসারীর মনে ‘অপরাধবোধ’ সৃষ্টি করে, সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে ‘দান’ বা ‘সেবা’ বিক্রি করাই তাদের মূল কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভ্যাঞ্জেলিস্ট Kenneth Copeland-এর মতো ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জেট বিমানের মালিকানা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও বহু তথাকথিত পীর বা ধর্মগুরু সাধারণ মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তারা মূলত ‘ভয়’ ও ‘আশা’র বাণিজ্য করেন।
অনেক দরিদ্র পরিবার সন্তানের শিক্ষা বা পুষ্টির টাকা বাঁচিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করে। অনেকে শেষ সম্বল বিক্রি করে হজ বা তীর্থযাত্রায় যান, ফলে পরিবার দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ফাঁদে পড়ে। এটি আবেগকে পণ্য বানানোর কৌশল।
রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহৃত হলে সমাজ বিভক্ত হয়।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী Samuel P. Huntington তার Clash of Civilizations তত্ত্বে ধর্মীয় বিভাজনকে সংঘাতের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দলগুলো একে অপরকে ‘ধর্মবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে নিজের সমর্থক বাড়াতে চায়, যার ফল দাঙ্গা ও সহিংসতা।
ধর্ম যখন ব্যবসায় পরিণত হয়, তখন বিজ্ঞান তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। বিজ্ঞান প্রশ্ন করতে শেখায়, আর ধর্মীয় ব্যবসা শেখায় প্রশ্নহীন আনুগত্য। মুক্তচিন্তক লেখকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা মূলত এই স্বার্থ রক্ষার অংশ।
ধর্ম এমন এক ব্যবসা, যেখানে বিক্রেতা অদৃশ্য, পণ্যটি কাল্পনিক এবং ক্রেতা তার শেষ সম্বল দিয়ে তা কেনে—এই ভয়ে যে, না কিনলে তার ক্ষতি হবে।
এই নিউজ ৩৫৫ বার পড়া হয়েছে